সব ধরনের ভাল বাসার গল্প পেতে এই ব্লগটি সব সময় ভিজিট করেন
সব ধরনের SMS পেতে ও এইখনে ভিজিট করেন
Showing posts with label koster golpo. Show all posts
Showing posts with label koster golpo. Show all posts

স্বপ্নীল নরক


"উফ্‌...ওই পোলা এইভাবে মায়ের পেডে কেউ লাত্থি মারে? মায়ের বুঝি কষ্ট লাগে না?"

গভীর মমতায় নিজের ফুলে ওঠা পেটে হাত বুলাতে বুলাতে কথাগুলো বলে কুসুম।মুখে একটা প্রশ্রয়ের ভাব নিয়ে কান খাড়া করে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকে তার পেটের দিকে।তার গর্ভের সন্তান কি বলে তা শোনার জন্য।এটা তার একটা খেলা।গত ক'মাস ধরে সে নিয়মিত এই খেলা খেলে আসছে।সে আপন মনে তার ছেলের সাথে কথা বলে।তার ছেলেও তার সাথে কথা বলে।কুসুম এখনও উৎসুক চোখে তাকিয়ে আছে তার ছেলের মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য।
কোন উত্তর পায় না সে।


-"কিরে ব্যাটা কথা বলস না ক্যান?রাগ হইছস্‌?না ভুখ লাগছে? লাগারইতো কথা।সকাল থাইক্যাতো তোরে কোন খাওন দেই নাই।কেমনে দিমু?সকাল

থাইক্যাতো আমি নিজেই কিছু খাই নাই।তুই খাইবি কোন থাইক্যা?"

আপন মনে কথা বলতে থাকে কুসুম।এবার আধশোয়া থেকে আস্তে আস্তে উঠে বসে সে।ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাতেই সকালের ছেলেটাকে দেখতে পায় সে।ছেলেটা ওর থেকে একটু দূরে ওভারব্রিজটার একটা রেলিঙের পাশে বসে আছে।তার সামনে দুইটা প্যাকেট রাখা।সকালে যখন কুসুম মগবাজারের এই ফুটওভারব্রিজটার উপর আসে তার কিছুক্ষণ পর সে ছেলেটাকে দেখে।ছেলেটা এখন যেখানে আছে সেখান থেকে বসে বসে তাকে দেখছিল।আর কুসুম যতবারই তার গর্ভের সন্তানের সাথে কথা বলছিল ততবারই সে মিটিমিটি হেসেছে।দুপুরে কুসুম আর ছেলেটাকে দেখেনি।এখন আবার প্যাকেট দুইটা নিয়ে বসে আছে।সকালে তার হাতে প্যাকেটগুলো ছিল না।

কুসুমের এখন প্রায় সাড়ে আটমাস চলছে।সে জানে না তার গর্ভের সন্তান ছেলে না মেয়ে।কিন্তু সে ধরেই নিয়েছে তার ছেলেই হবে।তার একটা ছেলের খুব শখ!

তার একটা ছেলে আছে।সে যখন তার আদরের ধন সোনার টুকরা ছেলেটাকে ঘরে একা রেখে বাথরুমে গোসল করতে গিয়েছে তার বাবুটা তখন তারস্বরে চিৎকার করছে।সে গোসল রেখে ভেজা কাপড়েই দৌঁড়ে বের হয়ে এসেছে।ছেলেটা যখন একটু বড় হল,যখন হাটতে শিখলো তখন তার আঁচল ধরে ধরে সে যেদিকে যায় সেদিকে যাচ্ছে।আবার কোন এক ঝুম বর্ষণের দিনে সে আর তার স্বামী মাঝখানে তার ছেলেটাকে বসিয়ে তাদের ঘরে বাংলা সিনেমা দেখছে।

এরকম স্বপ্ন সে তার উনিশ বছরের জীবনে বুঝতে শেখার পর থেকে কতবার যে দেখেছে তার কি কোন ইয়ত্তা আছে?নিশি কিংবা জাগরণ সেখানে কোন ব্যবধান তৈরী করতে পারেনি!

স্বামীর কথা মনে হতেই কুসুমের মন খারাপ হয়ে গেল।

"আহা...বেচারা এই রইদের মইধ্যেও রিকশা চালাইতাছে।কোন সময় যে খাইতে যাইব।তার নতুন বউ কি তারে ঠিকমত খাইতে দিতে পারব?ওই মাইয়া কি আর মানুষটার পছন্দ-অপছন্দ জানে?"
মনে মনে ভাবল কুসুম।নিজের অজান্তেই তার ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে আসলো।

ওই ছেলেটা এখনও তার দিকে তাকিয়ে আছে।নয় দশ বছর বয়স হবে ছেলেটার।পড়নে একটা ছেঁড়া লাল টিশার্ট আর ময়লা একটা প্যান্ট।উস্কখুস্ক চেহারা।
কুসুম ছেলেটাকে ডাকল-

-"এই পোলা এইদিকে আয়।"

ছেলেটা গুটিগুটি পায়ে কুসুমের দিকে আসছে।তার হাতে প্যাকেট দুইটা।

-"ডাকেন ক্যান?" কুসুমের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে ছেলেটা।

কুসুম বলল-

-"তোর কোন কাম-কাজ নাই?এইখানে সারাদিন ধইর‍্যা দাঁড়াইয়া আছস।ঘরে যাস্‌ না ক্যান?"

-"আমার ঘর নাই।"

-"ঘর নাই?তুই থাকস কই,তোর বাপ-মা কই?"

-"আমার বাপ-মা নাই।" স্পষ্ট উত্তর দেয় ছেলেটা।

এই ছেলে রাস্তার ছেলে বুঝাই যাচ্ছে।এদের যেমন ঘর থাকে না, তেমনি অনেকের বাবা মাও থাকে না।আর থাকলেও সন্তানের খোঁজ তারা রাখে না।

এই বাচ্চাগুলো সারাদিন পথে পথে কাজ করে আর রাতে ক্লান্ত হয়ে এই শহরের কোন এক ফুটপাতে কিংবা ওভারব্রিজে কিংবা রেলস্টেশনে শুয়ে পড়ে।

এ পৃথিবী বড় বড় শহর বন্দরে এদের খোলা জায়গায় শোয়ার সুযোগ দিয়ে একান্ত আলিঙ্গনে নিয়েছে ঠিকই কিন্তু ছাদের নিচে চার দেয়ালের ছোট্ট একটা ঘরে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে দিতে নারাজ।এরা সেই স্পর্ধাও দেখায় না!

কুসুম মায়াভরা চোখে তাকিয়ে আছে ছেলেটার দিকে।তার খুব মায়া লাগছে ছেলেটার জন্য।হঠাৎ করে ছেলেটা তার হাতের একটা প্যাকেট কুসুমের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল-

-"এইডা লও।তোমার লাইগ্যা আনছি।"

-"এইডা কি?"

-" বিরানী।পাশেই একটা বাসায় কুলখানি আছিল।তোমার কথা কইয়া এক প্যাকেট নিয়া আসছি।তুমিতো মনে হইতাছে সকাল থাইক্যা কিছু খাও নাই?"

কুসুমের চোখ ভিজে উঠলো।নিতান্ত অপরিচিত এই ছেলেটা তার জন্য কি মমতাই না দেখাচ্ছে।সে হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিল।

-"তুমি খাও।আমি নিচ থাইক্যা তোমার জইন্য পানি নিয়া আসতাছি।"

এইটুকু বলেই ছেলেটা নিচে ওভারব্রিজের সিঁড়ি ধরে নামতে শুরু করল।কুসুমের চোখে পানি চলে আসলো।সে প্যাকেট খুলে গোগ্রাসে গিলতে লাগলো। তার প্রচণ্ড ক্ষিধে পেয়েছিল।তাছাড়া তার গর্ভের সন্তানটারও তো খাবার প্রয়োজন। পানি নিয়ে আসার পর কুসুম ছেলেটার নাম জেনে নিল।ওর নাম রাজু।


২।

কুসুমের জন্ম ঢাকা শহরেই।অভাব,দারিদ্র,নিষ্ঠুরতা আর প্রকৃতির নির্মমতার সাথেই পাল্লা দিয়ে বেড়ে উঠেছে সে।পৃথিবীর সুন্দর দিকটার চেয়ে কদর্য, রুঢ় আর পরিহাসের দিকটার সাথেই সে বেশি পরিচিত।বুঝতে শিখার পর থেকেই সে দেখেছে তার রিকশাচালক বাবাকে প্রতিরাতে মাতাল হয়ে ঘরে ফিরে তার মাকে মারধর করতে।বাবার হাতে কোন কারণ ছাড়াই প্রতিনিয়ত মার খেতে হয়েছে তাকেও।

কুসুমের মা মমতা ছিল গ্রামের মেয়ে।শিক্ষার প্রদীপ জ্বলেনি তার মনে।নিজের গ্রামের ছেলে রহিমের সাথে বিয়ের পর স্বামীর সাথে ঢাকা চলে আসে মমতা।
রহিম রিকশা চালায় ঢাকায়।তারা শান্তিনগরে একটা বস্তিতে একটা ভাড়া নিল।বিয়ের বছরখানেকের মাথায় জন্ম হয় কুসুমের।কুসুমকে নিয়ে মমতার আহ্লাদ আর স্বপ্নের যেন শেষ নেই।কুসুমকে সে অনেক পড়ালেখা করাবে,অনেক বড় বানাবে।তার মেয়েটাকে এভাবে তার মত বস্তিতে থাকতে হবে না।কোন এক রাজপুত্রের সাথে তার মেয়ে থাকবে রাজপ্রাসাদে!......এইসব আরও কত কি।

রহিমের একার আয়ে সংসার চলে না।সংসারে একটা নতুন মুখ।তারও তো খাবার লাগে,কাপড় লাগে।মমতা কোন একটা কিছু করার চিন্তা করলো।কিন্তু সে কোন কাজ জানে না।তাই শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই সে মানুষের বাসায় বাসায় বুয়ার কাজ করতে লাগলো।

সংসার চলতে থাকে আপন গতিতে।জীবন আর স্বপ্নের মাঝে বিস্তর ফাঁক নিয়েই এগিয়ে যায় মমতার সংসার।কিন্তু কুসুম বড় হওয়ার সাথে সাথে তার সংসারে নেমে আসে দুঃস্বপ্ন।রহিম নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ে।একদিন রিকশা চালায়তো তিনদিন বসে থাকে।নেশায় বুদ হওয়া রহিমের অত্যাচার নির্যাতন সইতে হয় মমতাকে।তবুও সে স্বপ্ন দেখে।জীবন আর স্বপ্নের মাঝে থাকা প্রাচীরটুকু একদিন ধ্বসে পড়বে,হাতচানি দেবে স্বপ্নময় ভবিষ্যৎ।

কুসুমের পর মমতার আর কোন সন্তান হয়নি।এক দুর্ঘটনায় তার সন্তান ধারনের ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।

কুসুমের বয়স তখন বার বছর।এমনই সময়ে হঠাৎ করে একদিন নিরুদ্দেশ হয়ে যায় রহিম।দু'চোখে অন্ধকার দেখে মমতা।নেশায় বুদ হয়ে থাকা এই মানুষটার শত অত্যাচার,নির্যাতন এতদিন সে কি শুধু তার চিরন্তন নারী সত্ত্বা কিংবা অসহায়ত্তের জন্যই মেনে নিয়েছিল?সেখানে কি ভালবাসা ছিল না?ছিল।আর ছিল বলেই সে তার মাতাল স্বামীর ভয়ংকর অত্যাচারের পরপরই তার জন্য ভাত বেড়ে দিয়েছে।রাতে ঘরে ফিরতে দেরি হলে অস্তির হয়ে উঠেছে,ফিরুক না সে মাতাল হয়ে।তবুও ফিরেছে তো!

রহিম নিরুদ্দেশ হওয়ার পর মমতা আর কুসুম দেখল পৃথিবীর জঘন্যতম রূপ।চারপাশের মানুষের কটু কথা,কুপ্রস্তাব আর কুচাহনিতো আছেই।বাধ্য হয়েই মমতা তার আগের বস্তি ছেড়ে আজিমপুরে নতুন ঘরে উঠল।শত বঞ্চনা আর কষ্টের মাঝেও কুসুমকে নিয়ে সে তার স্বপ্ন পূরণে অবিচল।কুসুমকে সে পড়ালেখা করাচ্ছে এবং করাবেই।নিরুদ্দেশ হওয়ার দুই বছরের মাথায় একদিন রহিম এসে ঘরে হাজির। যেন কিছুই হয়নি,মাঝখানে সে এতদিন এদের সাথেই ছিল এমন একটা ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলো।প্রথম দিকে মততা একটু কথা শুনালেও সে মেনে নিল সব।হোক না অকাজের তবুও অভিভাবক বলে একজন কেউতো থাকবে মাথার উপর!

সময়ের সাথে ঘুরতে থাকে জীবনের চাকাও।রহিম আবার রিকশা চালায়।সে ফিরে গেছে তার আগের জীবনে।একদিন কাজ করেতো এক সপ্তাহ বসে থাকে। নেশা করে ঘরে ফিরে মমতা আর কুসুমকে মারধোর করে।নেশার টাকা চায়।না দিলে নির্যাতনের মাত্রা আরও বেড়ে যায় মমতার উপর।ইদানিং সে মমতাকে গালিগালাজ করে কুসুমকে মানুষের বাসায় কাজ করতে না পাঠানোর জন্য।তার মতে---মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ে কি লাভ?মেয়ে কি ডাক্তার,ইঞ্জিনিয়ার হবে নাকি?

শেষ পর্যন্ত কোন এক রিকশাওয়ালার গলায়ই ঝুলাতে হবে।তাহলে এখন আর পড়ে কি লাভ?তারচেয়ে কাজ করে কয়টা টাকা আনলে সংসারটার কিছুটা উন্নতি হয়।

মমতা কিছুতেই তার মেয়েকে কাজে পাঠাতে রাজী হয়না। ফলে অত্যাচারের মাত্রা বাড়তে থাকে মা মেয়ের উপর।

কুসুমের বয়স যখন পনের তখন একদিন রহিমের লাশ পাওয়া যায় আজিমপুরের রাস্তায়।অতিরিক্ত নেশা করতে করতে সে মরে পড়ে ছিল রাস্তায়।মমতা ভেঙে পড়ে ।

আস্তে আস্তে কিছু দিনের মধ্যেই শয্যাশায়ী হয়ে যায় সেও ।সংসার চালাতে শেষ পর্যন্ত পড়ালেখা বাদ দিয়ে মায়ের স্বপ্নকে বিসর্জন দিয়ে মমতার আগের কাজের জায়গাগুলোতে বুয়ার কাজ নেয় কুসুম।রহিম মারা যাওয়ার তিন বছরের মাথায় পৃথিবী থেকে বিদায় নেয় মমতাও।মায়ের মৃত্যুর তৃতীয় দিনেই কুসুমের বিয়ে হয়ে যায় তাদেরই বস্তির আধবুড়ো রিকশাচালক জহিরের সাথে।কুসুম জহিরের তৃতীয় স্ত্রী।এর আগের দুইজনকে সে তালাক দিয়েছে।

নতুন সংসারে অভ্যস্ত হতে থাকে কুসুম। পুরনো দিনের দুঃখ কষ্ট ভুলে নতুন করে জীবন সাজানোর স্বপ্নে বিভোর হয় সে।প্রায় আধবুড়ো এই মানুষটার সাথে

থাকতে,তাকে নিয়ে স্বপ্ন দেখতে তার খারাপ লাগে না।বরং ভালই লাগে।মাঝে মাঝে মানুষটা খুব খারাপ ব্যবহার করে,মারধোরও করে কিন্তু তাতে কি?মানুষটাকে ঘিরে স্বপ্ন দেখার অধিকারটুকুতো সে পেয়েছে।সেটাই বা কম কি?

বিয়ের কয়েকমাসের মাথায় কুসুম বুঝতে পারে সে অন্তঃসত্ত্বা।তার আনন্দের যেন আর বাঁধ মানে না।তার স্বপ্ন সত্যি হচ্ছে।তার ঘর আলো করে সন্তান আসবে। তার একটা ফুটফুটে ছেলে হবে।আনন্দ, কোলাহল আর শিশুর পবিত্র হাসিতে ভরে উঠবে তার ঘর।

কিন্তু চিরন্তন পোড় খাওয়া তার নিয়তি সেটা মানেনি।বদলে যেতে থাকে জহির।কুসুমের খাওয়া পড়ার দিকে তার কোন খেয়াল নেই।ঘরের জন্য বাজার সদাই করে না।একদিন রাতের আঁধারে ঘর থেকে জিনিসপত্র নিয়ে কুসুমকে ঘুমে রেখেই পালিয়ে যায় জহির।সে আরেকটা বিয়ে করেছে।নতুন বউ নিয়ে জহির কোথায় গিয়েছে তার আর কোন খোঁজ পায়না কুসুম।সে তখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা।

অথৈ জলে পড়ে কুসুম।সে কি করবে নে করবে কিছু বুঝে উঠতে পারে না।বস্তির মালিক জহির পালানোর দশদিনের মাথায় কুসুমকে ঘর থেকে বের করে দেয়। জহির দুই মাসের ভাড়া না দিয়েই পালিয়েছে।আর কুসুমও ভাড়া দিতে পারবে না।অন্যভাবেও টাকা শোধ করতে পারার মত অবস্তা তার এখন নেই।তাহলে ওকে আর ঘরে রাখার কারণ কি?দয়া শুধু তাকেই করা যায় যার কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়ার সুযোগ আছে!

একটা পুঁটলিতে নিজের দু'খানা কাপড় নিয়ে রাস্তায় নামে কুসুম।এই শহরে তার আর কোন আত্মীয় নেই।আগে যে বাসাগুলোতে কাজ করেছে সেগুলোতে গেল সে।

কেউ যদি একটু ঠাঁই দেয়।মেলেনি,কে দেবে?কে বাড়াবে জঞ্জাল!

কুসুমের খুব ভয় হচ্ছে।তার বারবারই মনে হচ্ছে তার বাচ্চাটা সময়ের আগেই জন্ম নেবে।শেষ ভরসা হিসেবে কুসুম গেল এক সরকারি হাসপাতালে।তার মনে ক্ষীণ আশা সন্তান সময়ের আগেই জন্ম নিতে পারে এটা দেখে যদি ওরা তাকে ভর্তি করে নেয়।তাহলে অন্তত থাকা খাওয়া নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না।
কিন্তু সেটা হল না।বরং নার্সের একঝাক বিরক্তি আর কটু কথা নিয়েই বের হয়ে আসতে হল তাকে।নার্স তাকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে লাগলো-

-"যত্তসব ফকিরের দল।সরকারি হাসপাতালকে এরা নিজের বাপের হোটেল মনে করে।যখন আসলাম ভর্তি হয়ে গেলাম।আর বসে বসে অন্নধ্বংস করলাম।

উনার মনে হল যে উনার বাচ্চা সময়ের আগে হবে আর উনি চলে আসলেন এখানে ভর্তি হতে।মামার বাড়ির আবদার!"

কোন জায়গায় আশ্রয় না পেয়ে কুসুম শেষ পর্যন্ত এসে আশ্রয় নিল মগবাজারের ফুটওভারব্রিজের উপর।এখন সে যেখানে আছে।মাথার উপর অন্তত একটা ছাদতো পাওয়া গেল।


৩।

কুসুম মগবাজারের ফুটওভারব্রিজে আছে তিনদিন হয়ে গেছে।এই তিনদিনে শুধু প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয়া ছাড়া অন্য কোন কারণে তাকে আর নিচে নামতে হয়নি।

রাজু ছেলেটা তার সব খাবার ব্যাবস্তা করছে।কিছুক্ষণ পরপরই এটাসেটা নিয়ে আসছে।কুসুম নিষেধ করেছে কিন্তু সে শুনেনি।তার জন্য এত কিছু কেন করছে?

কুসুমের এই প্রশ্নে রাজু শুধু হাসা ছাড়া আর কোন কথা বলেনি।

কুসুমের এখন প্রচণ্ড ভয় হচ্ছে।গত দু'দিন থেকে তার শরীর ভাল যাচ্ছে না।ব্যাথা উঠেছিল।কেন যেন তার বারবারই মনে হচ্ছে দু'একদিনের মধ্যেই কিছু একটা হয়ে যাবে।যদি এমন হয় তাহলে সে খুব সমস্যায় পড়বে।তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবে কে?রাজু?ওই পিচ্চি ছেলেটা কি পাড়বে?নার্সের কথায় তার কিছুটা স্বস্তি লাগছে। ওইদিন নার্স বলেছিল তার সন্তান সময়ের আগে হতে পারে কিন্তু এত আগে হওয়ার কথা নয়।কিন্তু নার্সের কথায় সে এখন আর ভরশা করতে পারছে না।গত দু'দিনের ব্যাথার ধরণ তার কাছে ভাল লাগছে না।

এখন আবার ব্যাথা শুরু হয়েছে।কুসুম তার ছেলের সাথে কথা বলা শুরু করল।ব্যাথা ভুলে থাকার জন্য এটাই তার সবচেয়ে ভাল উপায়।কুসুম যখন তার গর্ভের সন্তানের সাথে কথা বলে তখন সে তার সন্তানের উত্তরগুলো শুদ্ধ করে নেয়।তার ছেলে কত বড় মানুষ হবে,কত শিক্ষিত হবে!সে কি আর তার মত অশুদ্ধ ভাষায় কথা বলবে নাকি?কুসুম কথা বলায় মনোযোগ দিল...

-"কি গো বাবা এতক্ষণ ধইর‍্যা কথা কও না ক্যান?ঘুম পাইতাছে?"

-"না মা।"

-"তাইলে মার সাথে কথা কও না ক্যান?"

-"এগুলো কিসের শব্দ মা?"

-"এইগুলো গাড়ির শব্দ গো বাবা।"

-"গাড়ি কি মা?"

-"গাড়ি হইল এক জায়গা থাইক্যা আরেক জায়গায় যাওয়ার জিনিসরে বাপধন।"

মনে মনে হাসে কুসুম।তার ছেলেটা এত প্রশ্ন করে।তার খুব ভালও লাগে।তার ছেলে বড় মানুষ হবে।বড় মানুষদের জানার ইচ্ছা থাকে বেশি।তাই এরা প্রশ্নও করে বেশি।আবারও তার ছেলের প্রশ্নে তার ধ্যান ভাঙে কুসুমের...

-"গাড়িতে করে কারা যায় মা?"

-"এইগুলাতে কইরা সবাই যায়রে বাবা।তয় বড়লোকরা নিজেগো গাড়িতে কইরা ঘুরে।"

-"বড়লোক কি মা?"

-"যাগো বড় বাড়ি আছে।যারা বড় গাড়িতে কইরা,দামী কাপড় চোপড় পইড়া চলে তারাই বড়লোকরে বাজান।"

-"তুমি কি মা বড়লোক?"

-"নাগো বাজান আমি বড়লোক না।আমি খুব গরীব।আমার ঘর বাড়ি নাই।আমার কিচ্ছু নাই।তয় বাজান তুমি অনেক বড়লোক হইবা।তোমার সব থাকব।"

-"কিভাবে মা?"  

-"তোমার জন্ম হওয়ার পর যখন আমি কিছুটা সুস্থ হমু তখন ভাল দেইখ্যা কাজ নিমু।তোমারে পড়ালেখা করামু।তুমি অনেক বড় হইবা।অনেক বড় চাকরি করব্যা।"

কুসুমের মুখটা কালো হয়ে যাচ্ছে।ওর ব্যাথা বাড়ছে।সে তার ছেলের সাথে কথা বলা বন্ধ করলো।একটা আপেল আর একটা কমলা হাতে রাজু সামনে দাঁড়িয়ে আছে।কুসুম জিজ্ঞেস করলো এগুলো কোথায় থেকে এনেছে।রাজু উত্তর দেয়নি।নিশ্চয় কোন ফলের দোকান থেকে চুরি করেছে নয়ত হঠাৎ করে নিয়ে দৌঁড় দিয়েছে।কুসুমের মায়া লাগলো খুব।রাজুটা তার মতই।পৃথিবীতে কোথাও কেউ নেই।

কুসুম হাত বাড়িয়ে ফলগুলো নিল।রাজু আবার দৌঁড় দিয়েছে।নিশ্চয় অন্য কোন খাবারের সন্ধানে গেছে।

কুসুম ছটফট করছে।ওর ব্যাথা বেড়েছে খুব।ও এখন নিশ্চিত এটা সাধারণ কোন ব্যাথা নয়।তার এখনই হাসপাতালে যাওয়া দরকার। কিন্তু সে কিভাবে যাবে?সে শোয়া থেকে উঠে বসতে পর্যন্তও পারছে না।আর রাজুও এখানে নেই।

কুসুম কুঁকড়াতে লাগলো।ব্যাথায় সে নীল হয়ে গেছে।সে উঠে দাঁড়াতে চেষ্টা করলো।পারলো না।মনে মনে বারবার শুধু বলতে লাগলো-

-"রাজু,ও রাজু কই গেছসরে তুই...রাজু ও রাজু......"

কুসুম আর সহ্য করতে পারছে না।তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে।এখন রাজুই তার শেষ আশা,কিন্তু সে-ই তো নেই।পাশ দিয়ে কত মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। কেউ ফিরেও তাকাচ্ছে না।কুসুম জানে কেউ তাকাবে না।এই শহরের মানুষদের সবসময় ট্রেন ধরার তাড়া থাকে।এখানে সবাই যে যার জন্য।আর যারা তাকে এই অবস্তায় দেখছে তারাও একবার চেয়ে দেখে চলে যাচ্ছে।দেখেও না দেখার ভান কেউই করছে না।এযুগে তা করার প্রয়োজন নেই!একটা লোক তার দিকে তাকাচ্ছে দেখে কুসুম কোনরকমে হাত তুলে ডাকল।তার মনে আশা লোকটা যদি তাকে হাসপাতালে পৌঁছে দেয়।লোকটা মনে হল হঠাৎ করে ভূত দেখছে।এমন একটা ভাব নিয়ে হনহন করে কুসুমের পাশ দিয়ে চলে গেল।

কুসুম জোরে জোরে কাঁদছে।সে অনেক কষ্টে কয়েকবার চেষ্টার পর রেলিঙের শিক ধরে উঠে দাঁড়ালো।ব্যাথা তার সহ্যর সীমার বাইরে চলে গেছে অনেক আগেই।

"মা, তোমার কি হয়েছে মা?তুমি এমন করছ কেন?"

কুসুম অবাক হয়ে তার পেটের দিকে তাকাল।সে সবসময় তার সন্তানের সাথে কথা বললেও তার সন্তান কখনও আগ বাড়িয়ে তার সাথে কথা বলেনি।কিন্তু এখন বলছে।সে আস্তে আস্তে তার পেটে হাত বুলাতে বুলাতে বলল-

-"আমার খুব কষ্ট হইতাছেরে বাপ।খুব কষ্ট হইতাছে।"

-"কষ্ট কি মা?"

কুসুম এক পা এক পা করে ওভারব্রিজের প্রান্তের দিকে এগুচ্ছিল।হঠাৎ সে নিচের দিকে তাকিয়ে থমকে দাঁড়ালো।এক মা তার সন্তানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে আছে রাস্তা পার হবে বলে।সে এমন ভাবে বাচ্চাটাকে জড়িয়ে ধরে আছে যেন হাতটা একটু ঢিলে হলেই তার সন্তানকে কেউ ছিনিয়ে নিয়ে যাবে।এত কষ্টের মাঝেও কুসুমের মুখে একটা মিষ্টি করুণ হাসি ফুটে উঠল।কুসুম ব্রিজের মাঝখান থেকে নিচে নামার সিঁড়ির প্রায় পাশে চলে এসেছে।সে শুনতে পাচ্ছে তার ছেলে একটানা বলেই যাচ্ছে-

-"মা, কষ্ট কি?বলো না মা কষ্ট কি......?"

হঠাৎ করে একটা তীব্র চিৎকার করে উঠল কুসুম।তাকালো নিচের দিকে।তারপর একটা তীব্র আর্তনাদ.........

মুহূর্তেই মগবাজারের ফুটওভারব্রিজটার নিচে জমে উঠল একটা জটলা।কেন্দ্রবিন্দু প্রসব বেদনা সহ্য করতে না পেরে ওভারব্রিজের উপর থেকে লাফ দেয়া এক অসহায় মায়ের থেতলে যাওয়া নিথর দেহ।উৎসুক জনতার চোখে মুখে হাজারো প্রশ্ন......

"লাফ দিতে গেল কেন অভাগী?আর একটু কষ্ট করলেইতো হত।পাশেইতো হাসপাতাল।ওখানে গেলেইতো সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত।বাচ্চাটারেও বাঁচতে দিল না!......আহারে........."

কুসুম পড়ে আছে রাস্তায়।তার সাথে সাথে কষ্ট কি জানতে চাওয়া তার সন্তানের শেষ স্পন্দনটুকুও থেমে গেছে।কুসুমের চারপাশ ভেসে যাচ্ছে রক্তে।চারপাশেই রক্তের লাল লাল ধারা।শেষ বিকেলের মিষ্টি রোদ এসে পড়েছে তাতে।চিকচিক করছে জায়গাটা।মনে হচ্ছে সেখান থেকে প্রতিফলিত আলোর রশ্মি উঠছে।যেন সপ্নীল এই নরকে এক সপ্নাভিলাষী মায়ের স্বপ্নগুলোকে আলোকিত করে রাখার শেষ চেষ্টাটুকু করছে শেষ বিকেলের নরম আলো।  

তোমার অপেক্ষায়...


অনেকদিন হয়ে গেল তুমি চলে গেছ...
মোবাইল নাম্বার বদলে ফেলেছ...
Facebook ব্লক করে রেখেছ...
জানি আমাকে ছেড়ে ভালই আছ তবু জানতে ইচ্ছা করছে ...
আমি যখন কান্না করি সেই কান্না কি তোমাকে একটু স্পর্শ করে...
আমার কষ্টে কি তোমার বুকে এখনো রক্তক্ষরণ হয় ..
তুমি কি জানো আজ ও আমি তোমাকে আমার মনএ রেখেছি লক্ষী করে.
তুমি কি জানো আজ ঘুমের ঘোরে তোমার জন্য কেদে উঠি..
তোমার কি মনে আছে শেষ দেখার কথাগুলো ..
তোমার কি মনে আছে আমার কান্না..
তোমার কি মনে আছে তোমার কান্না আমার জন্য
তোমাকে আমি ভালবাসি গতকাল থেকে বেশি আগামীকাল থেকে কম.. আর আমার ভালবাসা কখনই কমবে না তোমার জন্য আমার ভালবাসা শুধু তোমার জন্য...
তোমার অপেক্ষায়......

ভালবাসার সুখ পাখি

Story : "ভালবাসার সুখ পাখি" | Valobasar Sukh Pakhi
Writer : Unknown


'নাহিদ' - সুদর্শন আর একেবারেই পাগলাটে একটা ছেলে। সারাদিন কাধে একটা গীটার নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ভার্সিটির সবাই ওকে গীটার-বয় বলেই ডাকে। নেকা মেয়ে গুলা যেন নাহিদ বলতেই অজ্ঞান। অথচ দুই চক্ষে সহ্য হয়না ছেলেটাকে আমার।
বি.বি.এ -৩য় বর্ষের ছাত্রী আমি। নাহিদ আমার ১বছর এর সিনিয়র। কোন কথাবার্তা ছাড়াই ও হঠাৎ একদিন আমকে প্রপস করে বসলো। কোন উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে গেলাম। পেছন ঘুর ঘুর করে বিরক্ত করার ছেলে ও না। কোথা থেকে যেন আমার নাম্বারটা যোগাড় করেছে। প্রতিদিন রাতে শুধু একটা করে মেসেজ করত কখনো ফোন করেনি। কোন রিপ্লাই না দিয়ে শুধু ওর মেসেজ গুলো পড়তাম প্রতিদিন। ব্যাপারটা ধীরে ধীরে ভাল লাগতে শুরু করলো। মনের আড়ালেই কখন ভাল লাগার বীজ বপন করে বসে আছি বুজতেই পারিনি।
পরপর তিনদিন ওর কোন মেসেজ না পেয়ে কেমন যেন অস্থির লাগছিল। পরদিন ভার্সিটিতে মনে মনে ওকে খুজতে থাকলাম। হঠাৎ দেখি সিমির খুব কাছাকাছি বসে ওকে গান শোনাচ্ছে। বুকের ভেতর চেপে থাকা আগুনটা যেন এবার দাউ দাউ করে জ্বলে উঠলো। নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। কিছু চিন্তা না করেই সবার সামনে বলে দিলাম ওকে ভালবাসার কথা। সাথে সাথে একটা মুচকি হাসি দিয়ে পেছন থেকে একটা লাল গোলাপ বের করে দিল। খানিকটা অবাক হলাম। পরে জানতে পারলাম মেসেজ না করা, আমাকে জেলাস করা, পুরোটাই সাজানো ছিল। আর তার প্রধান হাতিয়ার ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবী সিমি। চোখের জলটা থামাতে পারলাম না। সবার সামনেই কেদে দিলাম। একটা কান্না মানুষকে এতটা সুখ দিতে পারে জীবনে প্রথম অনুভব করলাম।
শুরু হল ভালবাসার আকাশে কষ্ট সুখের সাত রঙ মিশিয়ে একি স্বপ্ন দুটি হৃদয় দিয়ে আঁকা। ও আমাকে সুখ পাখি বলে ডাকে। ওর পাগলামি গুলা যেন একি সাথে আমকে কাদাই আবার হাসাই। অদ্ভুত একটা অনুভুতি।
আমকে নিয়ে ওর গান। স্বপ্নের ভেলায় চড়ে তারার দেশে যাওয়া। হাত ধরে বৃষ্টিতে ভেজা। মাঝ রাতে আমকে দেখার নাম করে আমার বাড়ির সামনে এসে দাড়িয়ে থাকা। ক্লাস ফাকি দিয়ে মুভি দেখতে যাওয়া। একই স্বপ্ন হাজার বার ভেঙ্গে নতুন করে গড়া। সব কিছু মিলিয়ে যেন আমার একটা পৃথিবী সুখের স্বর্গ ও।
দেখতে দেখতে একটা বছর কেটে গেল। ওর বি.বি.এ শেষ হল আর আমি ৪র্থ বর্ষে উঠলাম। যে ভয়টা বুকের ভেতর সব সময় কাজ করত সেটাই হল। আমার আর নাহিদ এর সম্পর্কের কথাটা বাসাই জানা জানি হয়ে গেল।
আব্বু আম্মুর ইচ্ছের বাইরে আপু পালিয়ে গিয়ে তার ক্লাস-মেট সহেল ভাইয়াকে বিয়ে করেছিল। ওদের ৪বছর এর রিলেশন বিয়ের এক বছরের মাথাই ছাড়াছাড়ি। এ ব্যাপারটাই যেন আমার স্বাধীনতার একমাত্র ঘাতক। সাময়িক ভাবে আমার ভার্সিটি যাওয়া বন্ধ। ফোনটাও আব্বুর কাছে। এক কথায় বন্দি আমি। আপুর ব্যাপারটার পর আব্বু অনেক অসুস্থ হয়ে পরেছিল এখনো সেই ধকল কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আব্বুর ইচ্ছের বাইরে কিছু বলা মানে তাকে মৃত্যুর পথে একধাপ এগিয়ে নেয়া। কিছুই বলতে পারলাম না।
এক সপ্তাহের মধ্যে আমার বিয়ে ঠিক করলো আব্বুর ব্যবসায়ী বন্ধু রাজ্জাক আঙ্কেলের ছেলে সুমন এর সাথে। নিঃশব্দে কাদা ছাড়া কিছুই যেন করার নেই আমার।
এদিকে নাহিদ পাগল এর মত চেষ্টা করছে আমার সাথে যোগাযোগ করার। কোন উপায় না পেয়ে সিমিকে আমার বাসায় পাঠালো খোজ নেবার জন্য। মানুষটা আমাকে অন্ধের মত ভালবাসে। এত বড় অন্যায় কি করে করবো আমি। কি করে কাদাবো এই মানুষটাকে। ঠিক করলাম পালিয়ে যাব। সবাইকে ফাকি দিয়ে অনেক কষ্ট করে বাসা থেকে বেরও হলাম। কিন্তু আপুর চলে যাওয়ার পর আব্বু আম্মুর কষ্ট লজ্জা সব কিছুর ছবিটা চোখের সামনে আবারও ভেসে উঠলো। পারলাম না। একটা ফোন ফ্যাক্স এর দোকান থেকে কাদতে কাদতে নাহিদ কে সরি বলে অর্ধেক রাস্তা থেকেই আবার বাসাই ফিরে আসলাম। এসে দেখি প্রত্যাশা অনুরূপ বাসার সবাই চুপচাপ বসে আছে। যে আব্বু আমকে কোন দিন ধমক দিয়ে কথা বলিনি সে আব্বু আমার গায়ে হাত তুললো। সারা রাত কাদলাম। কান্নাই যেন একমাত্র সঙ্গী এখন। না পারছি আব্বু আম্মুকে কষ্ট দিতে না পারছি নাহিদকে কাদাতে।
পরদিন সকালে রাজ্জাক আঙ্কেল এর একটা ফোন আমার জীবনটাতে একই সাথে মুক্তি আর পঙ্গুত্ব দান করলো। ডাক্তার এর মেডিকেল রিপোর্ট অনুযায়ী আমি কোনদিন মা হতে পারবো না। বিয়েটা ভেঙ্গে গেল। কাঁদবো না মুক্তির নিঃশ্বাস ফেলব বুজতে পারলাম না। শুধু স্থব্দ হয়ে থাকলাম।
নাহিদ এর সামনে দাঁড়ানোর মত মুখ আমার নেই। সিমির মাধ্যমে ও সব কিছু জানলো। আর সব জেনে শুনেই ওর আব্বুকে দিয়ে আবারও বিয়ের প্রস্তাব পাঠাল আমার বাসাই। প্রথম বার ফিরিয়ে দিলেও এবার আর পারল না। কারণটা সহজ। আব্বু আম্মু স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা লজ্জিত হয়ে নাহিদ এর এক আকাশ সমান ভালবাসার কাছে হার মানল। পাওয়া না পাওয়াই আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের আর সুখের দিন এটা।
পরদিন নাহিদ এর অনুরোধেই আব্বু আম্মুর অনুমতি নিয়ে ওর সাথে দেখা করতে গেলাম । কথা বলার শক্তিটা যেন হারিয়ে ফেলছি। কাপতে কাপতে ওর সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম।
ও কাছে এসে আমার হাত ধরে বলল- আমি শুধু তোমাকে চাই হেনা আমার আর কিচ্ছু দরকার নেই বিশ্বাস করো আমার শুধু তোমাকে হলেই চলবে। বল আমকে আর কখনো ছেড়ে যাবা নাতো ?
উত্তরে কিছুই বলতে পারলাম না। বুক ফেটে কান্না এলো। ওর এই সীমাহীন ভালবাসার কাছে আমি খুবি নগণ্য। কোথাই রাখবো ওর এতোটা ভালবাসা। কি দিয়ে শোধ করবো আমি। সুখের কান্নাটা আর থামাতে পারলাম না। চোখের সামনে থাকা স্বর্গটার দিকে তাকিয়ে অঝোরে কাদলাম। ও হাত দিয়ে চোখের জ্বল টুকু মুছে দিল।
ওকে হয়তো বাবা হবার সুখটা কোন দিনও আমি দিতে পারবো না। তবে আমার শেষ নিঃশ্বাসটা পর্যন্ত এক বিন্দু কষ্ট পেতে দিবো না ওকে। তাতে আমার মরন হলেও হাসতে হাসতে মেনে নেবো সেই মরণটাকে।
আমি ভালবাসি নাহিদ। অনেক বেশি ভালবাসি তোমাকে।

END